০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৫ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জোনাকি পোকা কেন হারিয়ে যাচ্ছে

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৫৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৯ Time View

এক সময় গ্রামের সন্ধ্যা মানেই ছিল মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা গাছের ফাঁকে অসংখ্য জোনাকির ঝিলিক। শিশুরা উঠানে দৌড়ে বেড়াত, হাতের মুঠোয় ধরতে চাইতো সেই জোনাকির আলো। রাতের আঁধারে তাদের আলোয় মিশে থাকতো এক অদ্ভুত মায়া। কিন্তু আজ সেই মায়া যেন হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। যে জোনাকিরা আমাদের শৈশবের রাত্রিগুলোকে আলোকিত করত, এখন তারা যেন শুধুমাত্র গল্পের জগতেই সীমাবদ্ধ। শৈশবের সেই সন্ধ্যে যেন আর নামে না। আলোর মশাল জ্বেলে জোনাকিরা আর আসে না। ক্রমেই যেন নিভে যাচ্ছে জোনাকির আলো। কী এমন হলো যে, জোনাকির সংখ্যা হঠাৎ এত কমে যাচ্ছে? এর কারণ-ই বা কি! জোনাকিরা আসলে এক ধরনের পোকা। পৃথিবীতে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতির জোনাকি পাওয়া যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, সব প্রজাতির জোনাকি আলো দেয় না। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকিই নয়, তাদের লার্ভা এমনকি ডিম থেকেও আলো নির্গত হয়। অর্থাৎ জন্মের আগেই তারা যেন আলো ছড়াতে শেখে- যেন প্রকৃতির ভেতরে লুকানো এক অলৌকিক শক্তি। আরো মজার তথ্য হচ্ছে, জোনাকির আলো পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকর আলো হিসেবে স্বীকৃত। তাদের আলোক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বলা হয় বায়োলুমিনেসেন্স, যেখানে লুসিফেরিন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি হয় নিখাদ আলো। এই আলোর বিশেষত্ব হলো এতে কোনো তাপ উৎপন্ন হয় না। মানে, জোনাকি জলে কিন্তু পোড়ে না! এজন্য বিজ্ঞানীরা একে বলেন, কোল্ড লাইট বা শীতল আলো। তুলনা করলে দেখা যায়, ইনক্যানডেসেন্ট বাল্বের আলোতে মাত্র ১০ শতাংশ আলোকশক্তি থাকে, বাকিটা তাপে নষ্ট হয়। কিন্তু জোনাকির আলো প্রায় ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ আলো। খাদ্যাভ্যাসেও জোনাকিরা বেশ মজার। লার্ভা অবস্থায় তারা ছোট শামুক, কৃমি কিংবা নরম দেহের পোকা খায়। কিছু প্রজাতির স্ত্রী জোনাকি আবার পুরুষ জোনাকিকে আকৃষ্ট করে এবং পরবর্তীতে শিকার করে খায়। যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘প্রিডেটরি রিহেভিয়ার’। প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকিদের কিন্তু খাওয়ার প্রয়োজন হয় না, কারণ তারা বেঁচে থাকে মূলত প্রজনন ও ডিম দেয়ার জন্য। জোনাকির আলো আসলে তাদের প্রধান ভাষা। এই আলো দিয়ে তার সঙ্গীকে আহ্বান করে, আবার কখনো শত্রুকেও সতর্ক করে। পুরুষ জোনাকি আলো জ্বেলে উড়ে বেড়ায়, আর স্ত্রী জোনাকি গাছের ডালে বসে সেই সংকেতের উত্তর দেয়। মূলত আলোর এই আদান-প্রদানই তাদের প্রেম ও টিকে থাকার গল্প। এছাড়া আক্রমণের সময় জোনাকি এক ধরনের তেতো ও বিষাক্ত তরল নিঃসরণ করে, যাকে বলে ‘রিফ্লেক্স ব্লিডিং’। এতে বেশিরভাগ শিকারী প্রাণী জোনাকিকে খেতে চায় না। তবে বাঁদুরের খাদ্য তালিকায় কিন্তু জোনাকি থাকে। এছাড়া জোনাকিরা সাধারণত পরিষ্কার ও স্যাঁতস্যাঁতে

পরিবেশে টিকে থাকে। তাই, কোন জায়গায় এই পোকার উপস্থিতি মানে হলো সেই জায়গার প্রকৃতি এখনো সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে। জোনাকি এক আকর্ষণীয় পোকা যা আমাদের রাতকে আলোকিত করে তোলে আর পরিবেশকে করে তুলে সুন্দর ও রহস্যময়। অদ্ভুত এক ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে আসে জোনাকি। শৈশবের কত রঙিন রাতের স্মৃতি জুড়ে লেখা আছে জোনাকির নাম। অথচ তাদের বিচরণ আর চোখে পড়েন আগের মতো। ফলশ্রুতিতে দিন দিন জোনাকির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গবেষকরা জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করেছেন এবং বেশ কিছু কারণ খুঁজেও পেয়েছেন। সর্বশেষ ২০২০ সালে সারা লুইসের নেতৃত্বে একটি দল জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা করে। তাতে উঠে এসেছে বাসস্থান হারানো, আলো দূষণ ও কীটনাশকের মাত্র ব্যবহারসহ বেশ কিছু কারণ। জোনাকিদের বেশিরভাগ প্রজাতিই পুকুর বা জলাধারের পাশে পচা কাঠ এবং বনাঞ্চলে লার্ভা হিসেবে গড়ে ওঠে। তাদের যেখানে জন্ম হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা সেখানেই অবস্থান করে। কিছু প্রজাতির জোনাকি জলাশয়ের কাছাকাছি থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। আবার কিছু প্রজাতিকে দেখা যায় শুকনো অঞ্চলে। তবে বেশিরভাগেরই দেখা মেলে মাঠ, বন এবং জলাভূমিতে। বসবাসের জন্য উষ্ণ, আদ্র এবং জলজ পরিবেশ, যেমন- পুকুর, নদী কিংবা জলধরা জোনাকিদের পছন্দের জায়গা। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের জোয়ারে তাদের বাসস্থান আজ হুমকির মুখে। খোলা মাঠ,বনাঞ্চল এবং জলাভূমিগুলো প্রতিনিয়ত ভরাট হয়ে যাচ্ছে, তার বিপরীতে এসব জায়গায় নির্মাণ হচ্ছে বড় বড় অট্টালিকা। পাশাপাশি নদী এবং সাগরে এখন ভাসছে আধুনিক নৌকা আর বিশাল জাহজ। উন্নয়নের এই ঝলক যত বাড়ছে, জোনাকিদের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্ধকার ও শান্ত পরিবেশ ততই হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমেই উন্নয়নের ফাঁদে আটকা পড়ছে, ফলে কমে যাচ্ছে এই আলোকিত পোকাগুলার সংখ্যা। এর সাথে বিশ্বজুড়ে ধ্বংস হচ্ছে জোনাকিদের বাসস্থান। টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সারা লুইস বলেন, ‘পৃথিবীতে অনেক প্রাণী তাদের আবাস হারিয়ে বিলুপ্তির পথে, এবং জোনাকিরাও সেই তালিকা থেকে বাদ নয়’। জোনাকিদের জীবনচক্র সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশগত শর্তের প্রয়োজন হয়। যখন সেই শর্তগুলো নষ্ট হয়ে যায়, তখন তাদের প্রজনন ব্যাহত হয়, ফলে পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। মালয়েশিয়ার এক বিশেষ প্রজাতির জোনাকি (pteroptyx tener) ব্যতিক্রমী আলো প্রদর্শন করতে পারে। তাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ম্যানগ্রোভ বন, কিন্তু সেখানে এখন ম্যানগ্রোভ কেটে পামওয়েল গাছ ও কৃষি খামারের বিস্তার ঘটছে। এতে প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আর ধীরে ধীরে এই প্রজাতিও হারিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে থাইল্যান্ডের ম্যানগ্রোভ  বনের নদীতীর ঘেষেঁ থাকা জোনাকিদের সংখ্যাও ক্রমশও কমছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার ঢেউয়ে নদীর পাড় ক্ষয় হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে তাদের আবাসস্থল। সেই সঙ্গে জাহাজের উজ্জ্বল বাতির আলো ও জোনাকিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে, মুছে দিচ্ছে রাতের অন্ধকারে তাদের নিরব জোসনা( বানান কারেকশন করে নিয়েন)। একইভাবে বাংলাদেশও দ্রুত কমছে জোনাকির সংখ্যা। এর মূল কারণ – নগরায়ন ও আলো দূষণ। গ্রামীন এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের আলো, রাস্তার আলোকবাতি আর বাড়িঘরে ব্যবহৃত উজ্জ্বল আলোর কারণে জোনাকিদের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় অন্ধকার মিলছে না। একইসাথে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক এর ব্যবহার ধ্বংস করছে তাদের খাদ্য ও লার্ভার বেঁচে থাকার পরিবেশ। এর ফলে ধীরে ধীরে আমাদের রাতের জোনাকি আলোকও হারিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জোনাকিদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাতের কৃত্রিম আলো বা আলো দূষণ। একসময় রাত মানেই ছিল অন্ধকারে ঝিলমিল জোনাকির আলো, কিন্তু এখন সেই অন্ধকারই হারিয়ে যাচ্ছে। টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারা লুইস ও তার গবেষণা দলের এক জরিপে দেখা গেছে – পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা রাতের বেলায়  কৃত্রিম আলোয় আলোকিত থাকে। এই অতিরিক্ত আলোর উপস্থিতিই জোনাকিদের প্রজনন ও জীবনচক্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। গবেষক অ্যাভালন ওয়েনস বলেন, জোনাকিরা তাদের দেহে থাকা বায়োলুমিনেসেন্স নামক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি করে। এই আলোর ঝলক দিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সঙ্গীকে আকৃষ্ট করে এবং প্রজনন সংকেত বিনিময় করে। কিন্তু মানুষের তৈরি অগনিত কৃত্রিম আলোর নিচে সেই সংকেত হারিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার সড়কবাতি, গাড়ির হেডলাইট, দোকানের উজ্জ্বল সাইনবোর্ড কিংবা ঘরের আলোকসজ্জার ঝলকে জোনাকির স্বাভাবিক আলোর প্যাটার্ন বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে তারা আর সঙ্গীকে খুঁজে পায় না এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্মও বাধাগ্রস্থ হয়। আগে যেখানে খেলার মাঠ, বন কিংবা নদীর ধারে অন্ধকারে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াতো জোনকিরা, এখন সেখানে ঢুকে পড়েছে উন্নয়নের আলো। নগরায়নের ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে শহর ও উপশহরের আশেপাশে। আমেরিকা, মালয়েশিয়া এমনকি বাংলাদেশেও এখন এই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে – অতিরিক্ত আলোর দখলে প্রকৃতির অন্ধকার হারিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে জোনাকিরাও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম থেকে শহর- সবখানে বেড়েছে নানা ধরনের দূষণ ও কীটনাশকের অযাচিত ব্যবহার। এই দুই বিপদ একসাথে জোনাকিদের জীবনের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে জোনাকির লার্ভার। এরা সাধারণত মাটি ও জলজ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, আর ঠিক সেখানেই বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ছে। একটি জোনাকি পূর্ণাঙ্গ বেড়ে উঠতে কয়েকমাস পর্যন্ত সময় নেয়- কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই বিষাক্ত কীটনাশক তাদের লার্ভাকে মেরে ফেলে। থাইল্যান্ডে ইতিমধ্য জোনাকিদের জন্য ক্ষতি করে হিসেবে চিহ্নিত তিনটি রাসায়নিক ক্লোরোপাইরিফস, গ্লাইফোসেট এবং প্যারাকোয়েট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে কোরিয়ায় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ ধরনের কীটনাশকের মধ্যে কয়েকটির প্রভাব এতটাই মারাত্মক যে, সেগুলো কারণে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ জোনাকিদের মৃত্যুহার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এমনকি তাদের ডিম দেয়ার ক্ষমতা ও শূন্য  থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমন কি মশা নিধনের জন্য ব্যবহৃত স্প্রেগুলোও জোনাকিদের জন্য সমান ক্ষতিকর। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভ গোলসন বলেন, “আলোদূষণ নিঃসন্দেহে জোনাকি সংখ্যা কমাচ্ছে, তবে কীটনাশকের ব্যবহার যে তাদের বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ – এটা ভুলে গেলে চলবে না। জোনাকির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের কৌতূহলও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন জোনাকি ট্যুরিজাম বা জোনাকি দর্শনভিত্তিক ভ্রমণের প্রচলন দেখা যাচ্ছে। জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলোতে জোনাকিদের আলোর নাচ উপভোগ করতে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক ভিড় জমান। মালয়েশিয়ার নদী তীরবর্তী বনভূমিতে বা থাইল্যান্ডের গ্রামীণ অঞ্চলে পর্যটকদের জন্য বিশেষ নৌ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়, যেখানে রাতের অন্ধকারে গাছের ডালে ঝুলে থাকা হাজারো জোনাকির আলোয় সৃষ্টি হয় জাদুকরী দৃশ্য। এই মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা এখন আন্তর্জাতিক পর্যটনের এক আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসব কিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে এক চরম বাস্তবতা। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় জোনাকি ট্যুরিজম চালু হয়েছে; সেখানে জোনাকিদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা, আলো, শব্দদূষণ এমনকি মোবাইল ফ্ল্যাশের ঝলকানিও তাদের প্রজনন ও জীবনচক্রের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যে জায়গাগুলো এক সময় অসংখ্য জোনাকির জন্য বিখ্যাত ছিল, সেখানেই এখন আলোহীন নীরবতা। জোনাকিরা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এখন তারা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। নানা দেশে গবেষণা, প্রদর্শনী কিংবা উপহার সামগ্রী তৈরীর নামে বিপুল পরিমাণ জোনাকি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে এই আলোকিত পোকাদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের sigma chemical company শুধুমাত্র জোনাকির শরীর থেকে লুসিফেরিন ও লুসিফেরেস ( যে যৌগের মাধ্যমে জোনাকি আলো উৎপন্ন করে)  নামের দুটি জৈব যৌগ সংগ্রহের জন্য তিন মিলিয়নের বেশি জোনাকি ধরে ফেলেছিল। অন্যদিকে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চীনে কয়েক মিলিয়ন জোনাকি সংগ্রহ ও বিক্রি করা হয়েছে- থিক পার্ক প্রদর্শনী, কৃত্রিম ‘রোমান্টিক’ আয়োজন এবং গিফট আইটেম তৈরির উদ্দেশ্যে। তবে পরিবেশবাদীদের আন্দোলন ও জনমতের চাপে চীনে এখন ব্যবসায়িকভাবে জোনাকি সংগ্রহের হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু এই বাণিজ্যিক শোষণ যে কত পোকার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তা হয়তো আর পূরণ করা সম্ভব না। একসময় যারা রাতের আঁধারে আলো ছড়াত, আজ তারা নিভে যাচ্ছে মানুষের ব্যবসায়িক লালশা ও নির্মম স্বার্থের শিকার হয়ে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সংকট। এর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের প্রতিটি স্তরে, বাদ যাচ্ছে না জোনাকিরাও। এই ক্ষুদ্র আলোকিত পোকাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন আর্দ্র ও সুনির্দিষ্ট জলবায়ু, কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে।

খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জোনাকিদের প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহের উপযোগী পরিবেশ ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও হঠাৎ বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও তাদের বাসস্থানকে করে তুলছে অনিরাপদ।

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব পরিবর্তন জোনাকিদের জীবনচক্র, প্রজনন আচরণ ও আলোক সংকেত বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় গভীর প্রভাব ফেলছে। ফলে তারা হারিয়ে ফেলছে প্রজনন সঙ্গী, কমে যাচ্ছে সংখ্যা, আর ঝুঁকির মুখে পড়ছে পুরো প্রজাতিটিই। এক সময় যে জোনাকিরা প্রকৃতির ভারসাম্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ছোবলে আজ তারাই নিভে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্ধকার প্রান্তে। জোনাকিদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রথমেই তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। বন-ঝোপ, আর্দ্র মাটি ও ঘাসে ভরা পরিবেশই জোনাকিদের টিকে থাকার উপযুক্ত স্থান। তাই তাদের আবাস যেন ধ্বংস না হয়, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে জোনাকিদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণ এলাকা বা “ফায়ার ফ্লাই জোন” গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর্দ্র পরিবেশ জোনাকিদের বসবাসের আদর্শ জায়গা। তারা অন্ধকার পছন্দ করে এবং অতিরিক্ত আলোকসজ্জা তাদের প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তাই অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বা পারিপার্শ্বিক এলাকায় আলো জ্বালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরের বাতি বন্ধ রাখা বা আলো কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে।কীটনাশকের ব্যবহারও কমাতে হবে। বিশেষ করে যেসব কীটনাশক জোনাকিদের সরাসরি ক্ষতি করে বা মৃত্যুর কারণ হয়, সেগুলো নিষিদ্ধ করতে হবে। এর পরিবর্তে জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির প্রচলন বাড়ানো জরুরি। এ ছাড়া, জোনাকির আলো দেখার জন্য যেসব পর্যটন আয়োজন বা ট্যুর পরিচালিত হয়, সেগুলোর জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশিকা  প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এসব ট্যুর যেন প্রকৃতি ও জোনাকিদের জীবনের জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বি এম সিয়াম আহমেদ 

শিক্ষার্থী, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ 

পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ

এসএসসি ব্যাচ- ২০২০

মোবাইল- 01605292884

ঠিকানা- ২১৩, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

Popular Post

আফরোজা রমজান গ্রানাডা গার্লস মাদ্রাসার জিয়াসমিনের দাপট, নির্যাতন করে বের করে দিল ছাত্রী

জোনাকি পোকা কেন হারিয়ে যাচ্ছে

Update Time : ০৬:৫৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এক সময় গ্রামের সন্ধ্যা মানেই ছিল মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা গাছের ফাঁকে অসংখ্য জোনাকির ঝিলিক। শিশুরা উঠানে দৌড়ে বেড়াত, হাতের মুঠোয় ধরতে চাইতো সেই জোনাকির আলো। রাতের আঁধারে তাদের আলোয় মিশে থাকতো এক অদ্ভুত মায়া। কিন্তু আজ সেই মায়া যেন হারিয়ে যাচ্ছে নিঃশব্দে। যে জোনাকিরা আমাদের শৈশবের রাত্রিগুলোকে আলোকিত করত, এখন তারা যেন শুধুমাত্র গল্পের জগতেই সীমাবদ্ধ। শৈশবের সেই সন্ধ্যে যেন আর নামে না। আলোর মশাল জ্বেলে জোনাকিরা আর আসে না। ক্রমেই যেন নিভে যাচ্ছে জোনাকির আলো। কী এমন হলো যে, জোনাকির সংখ্যা হঠাৎ এত কমে যাচ্ছে? এর কারণ-ই বা কি! জোনাকিরা আসলে এক ধরনের পোকা। পৃথিবীতে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতির জোনাকি পাওয়া যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, সব প্রজাতির জোনাকি আলো দেয় না। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকিই নয়, তাদের লার্ভা এমনকি ডিম থেকেও আলো নির্গত হয়। অর্থাৎ জন্মের আগেই তারা যেন আলো ছড়াতে শেখে- যেন প্রকৃতির ভেতরে লুকানো এক অলৌকিক শক্তি। আরো মজার তথ্য হচ্ছে, জোনাকির আলো পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকর আলো হিসেবে স্বীকৃত। তাদের আলোক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বলা হয় বায়োলুমিনেসেন্স, যেখানে লুসিফেরিন ও অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তৈরি হয় নিখাদ আলো। এই আলোর বিশেষত্ব হলো এতে কোনো তাপ উৎপন্ন হয় না। মানে, জোনাকি জলে কিন্তু পোড়ে না! এজন্য বিজ্ঞানীরা একে বলেন, কোল্ড লাইট বা শীতল আলো। তুলনা করলে দেখা যায়, ইনক্যানডেসেন্ট বাল্বের আলোতে মাত্র ১০ শতাংশ আলোকশক্তি থাকে, বাকিটা তাপে নষ্ট হয়। কিন্তু জোনাকির আলো প্রায় ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ আলো। খাদ্যাভ্যাসেও জোনাকিরা বেশ মজার। লার্ভা অবস্থায় তারা ছোট শামুক, কৃমি কিংবা নরম দেহের পোকা খায়। কিছু প্রজাতির স্ত্রী জোনাকি আবার পুরুষ জোনাকিকে আকৃষ্ট করে এবং পরবর্তীতে শিকার করে খায়। যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘প্রিডেটরি রিহেভিয়ার’। প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকিদের কিন্তু খাওয়ার প্রয়োজন হয় না, কারণ তারা বেঁচে থাকে মূলত প্রজনন ও ডিম দেয়ার জন্য। জোনাকির আলো আসলে তাদের প্রধান ভাষা। এই আলো দিয়ে তার সঙ্গীকে আহ্বান করে, আবার কখনো শত্রুকেও সতর্ক করে। পুরুষ জোনাকি আলো জ্বেলে উড়ে বেড়ায়, আর স্ত্রী জোনাকি গাছের ডালে বসে সেই সংকেতের উত্তর দেয়। মূলত আলোর এই আদান-প্রদানই তাদের প্রেম ও টিকে থাকার গল্প। এছাড়া আক্রমণের সময় জোনাকি এক ধরনের তেতো ও বিষাক্ত তরল নিঃসরণ করে, যাকে বলে ‘রিফ্লেক্স ব্লিডিং’। এতে বেশিরভাগ শিকারী প্রাণী জোনাকিকে খেতে চায় না। তবে বাঁদুরের খাদ্য তালিকায় কিন্তু জোনাকি থাকে। এছাড়া জোনাকিরা সাধারণত পরিষ্কার ও স্যাঁতস্যাঁতে

পরিবেশে টিকে থাকে। তাই, কোন জায়গায় এই পোকার উপস্থিতি মানে হলো সেই জায়গার প্রকৃতি এখনো সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে। জোনাকি এক আকর্ষণীয় পোকা যা আমাদের রাতকে আলোকিত করে তোলে আর পরিবেশকে করে তুলে সুন্দর ও রহস্যময়। অদ্ভুত এক ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে আসে জোনাকি। শৈশবের কত রঙিন রাতের স্মৃতি জুড়ে লেখা আছে জোনাকির নাম। অথচ তাদের বিচরণ আর চোখে পড়েন আগের মতো। ফলশ্রুতিতে দিন দিন জোনাকির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। গবেষকরা জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করেছেন এবং বেশ কিছু কারণ খুঁজেও পেয়েছেন। সর্বশেষ ২০২০ সালে সারা লুইসের নেতৃত্বে একটি দল জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে গবেষণা করে। তাতে উঠে এসেছে বাসস্থান হারানো, আলো দূষণ ও কীটনাশকের মাত্র ব্যবহারসহ বেশ কিছু কারণ। জোনাকিদের বেশিরভাগ প্রজাতিই পুকুর বা জলাধারের পাশে পচা কাঠ এবং বনাঞ্চলে লার্ভা হিসেবে গড়ে ওঠে। তাদের যেখানে জন্ম হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা সেখানেই অবস্থান করে। কিছু প্রজাতির জোনাকি জলাশয়ের কাছাকাছি থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করে। আবার কিছু প্রজাতিকে দেখা যায় শুকনো অঞ্চলে। তবে বেশিরভাগেরই দেখা মেলে মাঠ, বন এবং জলাভূমিতে। বসবাসের জন্য উষ্ণ, আদ্র এবং জলজ পরিবেশ, যেমন- পুকুর, নদী কিংবা জলধরা জোনাকিদের পছন্দের জায়গা। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের জোয়ারে তাদের বাসস্থান আজ হুমকির মুখে। খোলা মাঠ,বনাঞ্চল এবং জলাভূমিগুলো প্রতিনিয়ত ভরাট হয়ে যাচ্ছে, তার বিপরীতে এসব জায়গায় নির্মাণ হচ্ছে বড় বড় অট্টালিকা। পাশাপাশি নদী এবং সাগরে এখন ভাসছে আধুনিক নৌকা আর বিশাল জাহজ। উন্নয়নের এই ঝলক যত বাড়ছে, জোনাকিদের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্ধকার ও শান্ত পরিবেশ ততই হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্রমেই উন্নয়নের ফাঁদে আটকা পড়ছে, ফলে কমে যাচ্ছে এই আলোকিত পোকাগুলার সংখ্যা। এর সাথে বিশ্বজুড়ে ধ্বংস হচ্ছে জোনাকিদের বাসস্থান। টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সারা লুইস বলেন, ‘পৃথিবীতে অনেক প্রাণী তাদের আবাস হারিয়ে বিলুপ্তির পথে, এবং জোনাকিরাও সেই তালিকা থেকে বাদ নয়’। জোনাকিদের জীবনচক্র সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশগত শর্তের প্রয়োজন হয়। যখন সেই শর্তগুলো নষ্ট হয়ে যায়, তখন তাদের প্রজনন ব্যাহত হয়, ফলে পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। মালয়েশিয়ার এক বিশেষ প্রজাতির জোনাকি (pteroptyx tener) ব্যতিক্রমী আলো প্রদর্শন করতে পারে। তাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ম্যানগ্রোভ বন, কিন্তু সেখানে এখন ম্যানগ্রোভ কেটে পামওয়েল গাছ ও কৃষি খামারের বিস্তার ঘটছে। এতে প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, আর ধীরে ধীরে এই প্রজাতিও হারিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে থাইল্যান্ডের ম্যানগ্রোভ  বনের নদীতীর ঘেষেঁ থাকা জোনাকিদের সংখ্যাও ক্রমশও কমছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার ঢেউয়ে নদীর পাড় ক্ষয় হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে তাদের আবাসস্থল। সেই সঙ্গে জাহাজের উজ্জ্বল বাতির আলো ও জোনাকিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে, মুছে দিচ্ছে রাতের অন্ধকারে তাদের নিরব জোসনা( বানান কারেকশন করে নিয়েন)। একইভাবে বাংলাদেশও দ্রুত কমছে জোনাকির সংখ্যা। এর মূল কারণ – নগরায়ন ও আলো দূষণ। গ্রামীন এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের আলো, রাস্তার আলোকবাতি আর বাড়িঘরে ব্যবহৃত উজ্জ্বল আলোর কারণে জোনাকিদের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় অন্ধকার মিলছে না। একইসাথে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক এর ব্যবহার ধ্বংস করছে তাদের খাদ্য ও লার্ভার বেঁচে থাকার পরিবেশ। এর ফলে ধীরে ধীরে আমাদের রাতের জোনাকি আলোকও হারিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জোনাকিদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাতের কৃত্রিম আলো বা আলো দূষণ। একসময় রাত মানেই ছিল অন্ধকারে ঝিলমিল জোনাকির আলো, কিন্তু এখন সেই অন্ধকারই হারিয়ে যাচ্ছে। টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারা লুইস ও তার গবেষণা দলের এক জরিপে দেখা গেছে – পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা রাতের বেলায়  কৃত্রিম আলোয় আলোকিত থাকে। এই অতিরিক্ত আলোর উপস্থিতিই জোনাকিদের প্রজনন ও জীবনচক্রে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। গবেষক অ্যাভালন ওয়েনস বলেন, জোনাকিরা তাদের দেহে থাকা বায়োলুমিনেসেন্স নামক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আলো তৈরি করে। এই আলোর ঝলক দিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সঙ্গীকে আকৃষ্ট করে এবং প্রজনন সংকেত বিনিময় করে। কিন্তু মানুষের তৈরি অগনিত কৃত্রিম আলোর নিচে সেই সংকেত হারিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার সড়কবাতি, গাড়ির হেডলাইট, দোকানের উজ্জ্বল সাইনবোর্ড কিংবা ঘরের আলোকসজ্জার ঝলকে জোনাকির স্বাভাবিক আলোর প্যাটার্ন বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে তারা আর সঙ্গীকে খুঁজে পায় না এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্মও বাধাগ্রস্থ হয়। আগে যেখানে খেলার মাঠ, বন কিংবা নদীর ধারে অন্ধকারে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াতো জোনকিরা, এখন সেখানে ঢুকে পড়েছে উন্নয়নের আলো। নগরায়নের ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে শহর ও উপশহরের আশেপাশে। আমেরিকা, মালয়েশিয়া এমনকি বাংলাদেশেও এখন এই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে – অতিরিক্ত আলোর দখলে প্রকৃতির অন্ধকার হারিয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে জোনাকিরাও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম থেকে শহর- সবখানে বেড়েছে নানা ধরনের দূষণ ও কীটনাশকের অযাচিত ব্যবহার। এই দুই বিপদ একসাথে জোনাকিদের জীবনের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে জোনাকির লার্ভার। এরা সাধারণত মাটি ও জলজ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, আর ঠিক সেখানেই বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ছে। একটি জোনাকি পূর্ণাঙ্গ বেড়ে উঠতে কয়েকমাস পর্যন্ত সময় নেয়- কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই বিষাক্ত কীটনাশক তাদের লার্ভাকে মেরে ফেলে। থাইল্যান্ডে ইতিমধ্য জোনাকিদের জন্য ক্ষতি করে হিসেবে চিহ্নিত তিনটি রাসায়নিক ক্লোরোপাইরিফস, গ্লাইফোসেট এবং প্যারাকোয়েট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে কোরিয়ায় একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ ধরনের কীটনাশকের মধ্যে কয়েকটির প্রভাব এতটাই মারাত্মক যে, সেগুলো কারণে লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ জোনাকিদের মৃত্যুহার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এমনকি তাদের ডিম দেয়ার ক্ষমতা ও শূন্য  থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমন কি মশা নিধনের জন্য ব্যবহৃত স্প্রেগুলোও জোনাকিদের জন্য সমান ক্ষতিকর। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভ গোলসন বলেন, “আলোদূষণ নিঃসন্দেহে জোনাকি সংখ্যা কমাচ্ছে, তবে কীটনাশকের ব্যবহার যে তাদের বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ – এটা ভুলে গেলে চলবে না। জোনাকির সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের কৌতূহলও একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন জোনাকি ট্যুরিজাম বা জোনাকি দর্শনভিত্তিক ভ্রমণের প্রচলন দেখা যাচ্ছে। জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলোতে জোনাকিদের আলোর নাচ উপভোগ করতে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক ভিড় জমান। মালয়েশিয়ার নদী তীরবর্তী বনভূমিতে বা থাইল্যান্ডের গ্রামীণ অঞ্চলে পর্যটকদের জন্য বিশেষ নৌ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়, যেখানে রাতের অন্ধকারে গাছের ডালে ঝুলে থাকা হাজারো জোনাকির আলোয় সৃষ্টি হয় জাদুকরী দৃশ্য। এই মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা এখন আন্তর্জাতিক পর্যটনের এক আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসব কিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে এক চরম বাস্তবতা। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় জোনাকি ট্যুরিজম চালু হয়েছে; সেখানে জোনাকিদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকা, আলো, শব্দদূষণ এমনকি মোবাইল ফ্ল্যাশের ঝলকানিও তাদের প্রজনন ও জীবনচক্রের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যে জায়গাগুলো এক সময় অসংখ্য জোনাকির জন্য বিখ্যাত ছিল, সেখানেই এখন আলোহীন নীরবতা। জোনাকিরা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং এখন তারা বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। নানা দেশে গবেষণা, প্রদর্শনী কিংবা উপহার সামগ্রী তৈরীর নামে বিপুল পরিমাণ জোনাকি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে এই আলোকিত পোকাদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের sigma chemical company শুধুমাত্র জোনাকির শরীর থেকে লুসিফেরিন ও লুসিফেরেস ( যে যৌগের মাধ্যমে জোনাকি আলো উৎপন্ন করে)  নামের দুটি জৈব যৌগ সংগ্রহের জন্য তিন মিলিয়নের বেশি জোনাকি ধরে ফেলেছিল। অন্যদিকে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চীনে কয়েক মিলিয়ন জোনাকি সংগ্রহ ও বিক্রি করা হয়েছে- থিক পার্ক প্রদর্শনী, কৃত্রিম ‘রোমান্টিক’ আয়োজন এবং গিফট আইটেম তৈরির উদ্দেশ্যে। তবে পরিবেশবাদীদের আন্দোলন ও জনমতের চাপে চীনে এখন ব্যবসায়িকভাবে জোনাকি সংগ্রহের হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু এই বাণিজ্যিক শোষণ যে কত পোকার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তা হয়তো আর পূরণ করা সম্ভব না। একসময় যারা রাতের আঁধারে আলো ছড়াত, আজ তারা নিভে যাচ্ছে মানুষের ব্যবসায়িক লালশা ও নির্মম স্বার্থের শিকার হয়ে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সংকট। এর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের প্রতিটি স্তরে, বাদ যাচ্ছে না জোনাকিরাও। এই ক্ষুদ্র আলোকিত পোকাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন আর্দ্র ও সুনির্দিষ্ট জলবায়ু, কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে।

খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জোনাকিদের প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহের উপযোগী পরিবেশ ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও হঠাৎ বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও তাদের বাসস্থানকে করে তুলছে অনিরাপদ।

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব পরিবর্তন জোনাকিদের জীবনচক্র, প্রজনন আচরণ ও আলোক সংকেত বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় গভীর প্রভাব ফেলছে। ফলে তারা হারিয়ে ফেলছে প্রজনন সঙ্গী, কমে যাচ্ছে সংখ্যা, আর ঝুঁকির মুখে পড়ছে পুরো প্রজাতিটিই। এক সময় যে জোনাকিরা প্রকৃতির ভারসাম্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ছোবলে আজ তারাই নিভে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্ধকার প্রান্তে। জোনাকিদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রথমেই তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। বন-ঝোপ, আর্দ্র মাটি ও ঘাসে ভরা পরিবেশই জোনাকিদের টিকে থাকার উপযুক্ত স্থান। তাই তাদের আবাস যেন ধ্বংস না হয়, সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে জোনাকিদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণ এলাকা বা “ফায়ার ফ্লাই জোন” গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর্দ্র পরিবেশ জোনাকিদের বসবাসের আদর্শ জায়গা। তারা অন্ধকার পছন্দ করে এবং অতিরিক্ত আলোকসজ্জা তাদের প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তাই অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বা পারিপার্শ্বিক এলাকায় আলো জ্বালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরের বাতি বন্ধ রাখা বা আলো কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে।কীটনাশকের ব্যবহারও কমাতে হবে। বিশেষ করে যেসব কীটনাশক জোনাকিদের সরাসরি ক্ষতি করে বা মৃত্যুর কারণ হয়, সেগুলো নিষিদ্ধ করতে হবে। এর পরিবর্তে জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির প্রচলন বাড়ানো জরুরি। এ ছাড়া, জোনাকির আলো দেখার জন্য যেসব পর্যটন আয়োজন বা ট্যুর পরিচালিত হয়, সেগুলোর জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশিকা  প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এসব ট্যুর যেন প্রকৃতি ও জোনাকিদের জীবনের জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বি এম সিয়াম আহমেদ 

শিক্ষার্থী, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ 

পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ

এসএসসি ব্যাচ- ২০২০

মোবাইল- 01605292884

ঠিকানা- ২১৩, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০